রাজনীতি ডেস্ক:
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শুধু দলের নামের পার্থক্য, চরিত্রের কোনো তফাত নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে।
সোমবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আয়োজিত ‘রক্তেভেজা ২৮ অক্টোবর, ফ্যাসিবাদের উত্থান: কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস ফ্যাসিবাদের ইতিহাস। দলটি ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্রের কথা বলে, আর ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্রকে হত্যা করে ফ্যাসিবাদ কায়েম করে। তাঁর অভিযোগ, চাঁদাবাজি, খুন, দখলদারি, হাট-বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি দখল, বালুঘাট, লেগুনা ও বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক আধিপত্যের মতো কর্মকাণ্ড আগের মতোই চলছে; শুধু সুবিধাভোগীদের নাম বদলেছে।
সরকারপ্রধান তারেক রহমানের সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, গণভোটের একটি সিদ্ধান্ত মেনে অন্যটি প্রত্যাখ্যান করা এবং বিরোধী দলকে আলোচনার বাইরে রেখে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সব পক্ষের মতামত নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই ঘটনার পর মামলা হলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মামলা প্রত্যাহার এবং নথিপত্র গায়েব করে দেয় বলে তাঁদের অভিযোগ। বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে ওই মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করে জড়িতদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানান তিনি।
সেদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপির সঙ্গে যৌথ সমাবেশের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে বিএনপি তাতে সম্মত না হয়ে পৃথক কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয় বলে দাবি করেন তিনি। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশ নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি সেদিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং তৎকালীন সরকারের দায়দায়িত্ব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, ওই সময়ের সহিংসতা ও রাজনৈতিক সমঝোতার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে দেশে অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে বাকশাল প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সীমিত করা এবং অধিকাংশ সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। পরে শেখ হাসিনার শাসনামলেও গণতন্ত্র সংকুচিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর দাবি, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সহিংসতার পর দেশে এক-এগারোর অগণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুরোনো ও নতুন ফ্যাসিবাদের চরিত্র একই: হামিদুর রহমান আযাদ
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ফ্যাসিবাদের উত্থান শুধু ২৮ অক্টোবরের ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, পরবর্তী সময়ের নির্বাচন এবং দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের মধ্য দিয়ে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো বর্তমান বিএনপি সরকার বাতিল করে দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পুরোনো ফ্যাসিবাদ ও নতুন ফ্যাসিবাদের মধ্যে মৌলিক চরিত্রগত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না।
সেমিনারে অন্যদের বক্তব্য
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান। ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপির সভাপতিত্বে এবং সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম।
এ ছাড়া ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় নিহত সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামসুন্নাহার রুবি এবং হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের বাবা তাজুল ইসলাম বক্তব্য দেন। এ সময় ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিনসহ জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনার থেকে বক্তারা ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের, শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

