কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি:
খুলনার কয়রা উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য-সংগ্রহকারী পদে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের সময় বয়সসীমা অতিক্রম করায় শাহনাজ পারভীন ও নিগার সুলতানা নামে দুই প্রার্থীর আবেদন বাতিল করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে তথ্য-সংগ্রহকারী হিসেবে শাহনাজ পারভীনের নাম দেখা যায়। এমনকি মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের নির্বাচিত ১১ জনের তালিকার শেষে তাঁর নাম হাতে লিখে যুক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে নিগার সুলতানার নিয়োগ বাতিল করা হলেও শাহনাজের নাম বহাল রয়েছে।
শাহনাজ পারভীন কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের দাউদ মল্লিকের মেয়ে। স্থানীয় সূত্রে তাঁর ইউনিয়ন মহিলা লীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জনবল নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পর থেকেই নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে উপজেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাতটি ইউনিয়নে ৮১ জন তথ্য-সংগ্রহকারী ও আটজন সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৯৪৯টি। গত ৩০ জুলাই যাচাই-বাছাই শেষে ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় ৩৫৬টি আবেদন বাতিল করা হয়।
নিয়োগ সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও সেদিন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত আবেদনকারীদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরবর্তী দুই দিনও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর করা ফলাফলের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর হলেও তা প্রকাশ করা হয় ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়।
প্রকাশিত ফলাফলে মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ১১ জন তথ্য-সংগ্রহকারীর তালিকার শেষে শাহনাজ পারভীনের নাম হাতে লেখা অবস্থায় দেখা যায়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও বয়স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
স্থানীয়দের দাবি, তথ্য-সংগ্রহকারী পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪০ বছর। তবে শাহনাজ পারভীনের বয়স ওই সীমার চেয়ে বেশি। মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. ফেরদাউস বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী শাহনাজের বয়স ৪২ বছর। তাঁর দাবি, শাহনাজ ইউনিয়ন মহিলা লীগের পদধারী নেত্রী এবং তাঁর পরিবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে।
কয়রা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার সুপারিশে শাহনাজ পারভীন পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই নিয়োগ পেয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
নিয়োগপ্রার্থী জিয়াউল হক অভিযোগ করেন, তথ্য-সংগ্রহকারী পদে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়োগ পাননি। তাঁর দাবি, শত শত পরীক্ষার্থীকে গভীর রাত পর্যন্ত পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। অথচ কয়েকজন পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। পাশাপাশি নিয়োগ কমিটির কয়েকজনের আত্মীয়-স্বজনও নিয়োগ পেয়েছেন বলে তাঁর দাবি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিয়োগ কমিটির এক সদস্য বলেন, বয়স বেশি হওয়ায় যাচাই-বাছাইয়ের সময় শাহনাজ পারভীনের আবেদন বাতিল করা হয়েছিল। ফলে তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি বলেই তিনি জানতেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে তাঁর নাম দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও কয়রা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শুরুতেই ওই নারীকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। পরবর্তীতে একজন প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে তিনি নিয়োগ পেয়েছেন। এর বেশি কিছু বলতে চাই না। বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় আছি।’
জানতে চাইলে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নিয়োগ কমিটির সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া শেষ করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এরপরও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির কাছে অভিযোগগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং শাহনাজ পারভীনের বয়স ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়ে পৃথকভাবে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

