খুলনা প্রতিনিধি:
খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত কয়েকটি অপরাধ, বিশেষ করে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা বিবেচনায় নিয়ে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ অভিযান (স্পেশাল ড্রাইভ) শুরু করেছে জেলা পুলিশ। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে শুরু হওয়া এ অভিযানে বুধবার বিকেল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের বড় একটি অংশ অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের অভিযানের তথ্য অপরাধীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজন ওয়াচারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার খুলনা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চান তিনি। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
সরকার ওমর ফারুক বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে লাভের ভাগাভাগি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারও হত্যাকাণ্ড বাড়াচ্ছে। এ কারণে বিশেষ অভিযানে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জেলা পুলিশ জানায়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাদক, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধ দমনে নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এবার বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে। অভিযানে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী, দুষ্কৃতকারী ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আদালতের পরোয়ানা তামিলসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার জানান, গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত অভিযান চললেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। আগের অভিযান যথেষ্ট তীব্র ছিল না বলেও স্বীকার করেন তিনি। এবার কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন।
রূপসায় নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও এক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ওই ঘটনায় পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা যথাযথভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি ভাড়াটিয়া শনাক্তকরণ ও সিসিটিভি ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টিও উঠে আসে। পুলিশের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে বাসাবাড়ির ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে কোনো এলাকায় কে বসবাস করছেন, সে তথ্য অনেক সময় পুলিশের কাছে থাকে না। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে সিসিটিভি স্থাপনে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার বলেন, এবার ২৪ ঘণ্টা চেকিং ও দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাদক স্পট, সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য আস্তানা এবং চাঁদাবাজদের এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।
তিনি আরও বলেন, একক প্রচেষ্টায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় এবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি), জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনাও এ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। রাজনৈতিক কোনো অনুরোধে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২৫টি মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হলেও ১০টি এখনো অনুদ্ঘাটিত রয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নয়টি গুলি করে টার্গেট কিলিং, তিনটি মাদককেন্দ্রিক বিরোধে, ১৩টি সামাজিক দ্বন্দ্ব বা মারামারিতে এবং দুটি রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের জেরে ঘটেছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত কারণে দুটি, শ্বাসরোধে নবজাতক হত্যার দুটি এবং পারিবারিক বা পরকীয়াজনিত কারণে চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
পুলিশের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গুলি করে সংঘটিত টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনাগুলোর পেছনেও মূলত মাদককেন্দ্রিক বিরোধের প্রভাব রয়েছে।
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের দিক থেকে রূপসা উপজেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ দুটি টার্গেট কিলিংয়ের পর রূপসাসহ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা—এই চার থানাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ২৪ ঘণ্টা অভিযান, চেকপোস্ট ও ব্লক রেইড চালানো হচ্ছে। নড়াইল ও যশোরসহ আশপাশের জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে এসব এলাকায় অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, বিশেষ অভিযানের প্রথম দিনেই প্রায় ২৫০টি ইয়াবা ও এক কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে গ্রেপ্তারদের একটি বড় অংশ অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের গতিবিধি ও অভিযানের তথ্য অপরাধীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজন ওয়াচারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, রূপসাকে অপরাধের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করার পেছনে ভৌগোলিক ও জনবসতিগত কারণও রয়েছে। খুলনা শহরের কাছাকাছি হলেও নদীর কারণে শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অপরাধ করে নদীপথে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘনবসতি, অসংখ্য সরু গলি ও শাখা-প্রশাখা সড়ক অপরাধীদের আত্মগোপন এবং দ্রুত স্থান পরিবর্তনে সহায়তা করে।
এদিকে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক ও গণমাধ্যমকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা চেয়েছে খুলনা জেলা পুলিশ। প্রথম দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার ও আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

