এম সাইফুল ইসলাম
আজ বাগেরহাটে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর এই সফরকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাগেরহাটবাসীর চাওয়া কেবল আশ্বাস নয়, বরং দীর্ঘদিনের উন্নয়নবঞ্চনা কাটিয়ে একটি আধুনিক, শিক্ষাবান্ধব ও ক্রীড়ামুখী জেলা গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ।
বাগেরহাট ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ একটি জেলা। ষাটগম্বুজ মসজিদসহ বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শন, সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার, কৃষি, মৎস্য ও সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্প—সব মিলিয়ে এ জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অনেক। অথচ যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা ও ক্রীড়ার অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বাগেরহাটের সম্ভাবনাকে এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো যায়নি। এ বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনটি দাবি তুলে ধরতে চাই।
প্রথম দাবি: বাগেরহাটে বিমানবন্দর নির্মাণ
আধুনিক অর্থনীতিতে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। বাগেরহাটে একটি বিমানবন্দর নির্মিত হলে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জরুরি চিকিৎসাসেবার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে মোংলা বন্দর, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় এটি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিমানবন্দর নির্মাণের আগে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সম্ভাব্য চাহিদা, পরিবেশগত প্রভাব, জমির প্রাপ্যতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা যাচাই করা জরুরি। সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি, বাগেরহাটে বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি সরকারি সমীক্ষা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। সম্ভাবনা ইতিবাচক হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হোক।
দ্বিতীয় দাবি: মোরেলগঞ্জে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, গবেষণা ও সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বাগেরহাটসহ আশপাশের জেলার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার নতুন সুযোগ পাবে।
বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা, খুলনা কিংবা দেশের অন্যান্য শহরে যেতে হয়। এতে পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ে। প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকের জন্য উচ্চশিক্ষার স্বপ্নও কঠিন হয়ে পড়ে। মোরেলগঞ্জে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে এসব বাধা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গবেষণার সুযোগ বাড়তে পারে। মোরেলগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, মৎস্য, উপকূলীয় উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তবে এ উদ্যোগের আগে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা, শিক্ষার্থীর চাহিদা, শিক্ষকসংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিষয়গুলোও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি, মোরেলগঞ্জে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পথ তৈরি করা হোক।
তৃতীয় দাবি: বাগেরহাটে জাতীয় মানের স্টেডিয়াম নির্মাণ
খেলাধুলা তরুণদের সুস্থ জীবন গঠনের পাশাপাশি মাদক, অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাগেরহাটে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে, কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন, মানসম্মত মাঠ এবং বড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাব তাদের বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটি জাতীয় মানের স্টেডিয়াম নির্মিত হলে সেখানে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন খেলা আয়োজনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকসসহ বিভিন্ন খেলায় তরুণদের প্রশিক্ষণ ও প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।
শুধু স্টেডিয়াম নির্মাণ করলেই হবে না। এর সঙ্গে আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা, ইনডোর সুবিধা, নারী খেলোয়াড়দের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, প্রশিক্ষক নিয়োগ এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনাও থাকতে হবে। স্টেডিয়ামটি যেন কেবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের স্থাপনা হয়ে না থাকে, বরং সারা বছর খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি, বাগেরহাটে একটি জাতীয় মানের স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক এবং জেলার তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো হোক।
প্রতিশ্রুতি নয়, চাই পরিকল্পিত বাস্তবায়ন
বাগেরহাটের এই তিনটি দাবি বিচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া নয়। বিমানবন্দর যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াতে পারে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে, আর জাতীয় মানের স্টেডিয়াম তরুণদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সমন্বিতভাবে এগুলো বাস্তবায়িত হলে বাগেরহাটের উন্নয়নযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
আমরা জানি, বড় অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ, সময়, পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন। তাই রাতারাতি সব দাবি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা নয়; বরং প্রতিটি দাবির বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ, সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাগেরহাট সফর তাই শুধু আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা শোনার একটি সুযোগ হয়ে উঠুক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে এসব দাবির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হোক।
বাগেরহাটের মানুষ উন্নয়ন চায়, শিক্ষার সুযোগ চায়, খেলাধুলার পরিবেশ চায়। তারা চায় নিজেদের জেলাতেই সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলুক।

