রাজনীতি ডেস্ক:
সারা দেশে সারের সংকট এবং সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ দাবি জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ সময় তিনি লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে সংকটের অভাব নেই। সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের কারণে কৃষি খাত ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কৃষিমন্ত্রীর হলেও এ বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাঁর অভিযোগ, জেলা পর্যায়ের কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় সদস্য মনোনয়নের ফলে যোগ্য ব্যক্তিদের ডিলার হওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা দাবি করেন, সরকারের অব্যবস্থাপনা, ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, কালোবাজারে সার বিক্রি এবং চোরাচালানের কারণে দেশে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম শর্তও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দিনাজপুর ও রংপুরের বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় দলীয় প্যাডে তৈরি তালিকা এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গবেষণামূলক প্রতিবেদন ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর অনুসন্ধানে ১৪ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনি এলাকায় সারের তীব্র সংকটের তথ্য উঠে এসেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক এলাকার বাসিন্দাকে অন্য এলাকায় ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তি, একই পরিবারের একাধিক সদস্য এবং ভুয়া গুদাম ও চুক্তিনামা দেখিয়েও কেউ কেউ ডিলারশিপ পেয়েছেন। রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় ডিলার নিয়োগের তালিকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের নাম একসঙ্গে থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।
সরকারের সমালোচনা করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ডিলার নিয়োগে নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশনাও লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁর ভাষ্য, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির পরিবর্তে ‘সবার আগে দল’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
জামায়াতের ছয় দফা দাবি
সংবাদ ব্রিফিংয়ে সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থা নিয়ে ছয় দফা দাবি তুলে ধরে জামায়াত।
দলটির দাবিগুলো হলো—ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া; ডিলার নিয়োগের যোগ্যতার মানদণ্ড, তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া ও লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি প্রকাশ করা; ডিলারশিপ দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা; সারের সংকট নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতির অসংগতি যাচাই করে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত ব্যাখ্যা ও তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া।
মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সারের সংকট নিয়ে সরকার জাতিকে অসত্য তথ্য দিয়েছে। গত ছয় থেকে সাত মাসে সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয়করণ ও দুর্নীতি এবং মন্ত্রীদের বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে দলটি উদ্বিগ্ন বলেও জানান তিনি। নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা বন্ধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা।
তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দমন-পীড়নমুক্ত মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড সেই প্রত্যাশা পূরণের পথে বাধা সৃষ্টি করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন তিনি।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার গণভোটে নির্ধারিত আইনি কাঠামোর আলোকে সংবিধান সংশোধনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রাজপথে সংকট না বাড়িয়ে সংসদের আগামী অধিবেশনে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংবিধান সংস্কার এবং সার, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো জনদুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এ সময় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মো. আব্দুর রব, অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, নূরুল ইসলাম বুলবুল, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও ড. রেজাউল করিমসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

