স্টাফ রিপোর্টার
নাশকতার মামলায় অভিযুক্ত কয়েকজনের উপস্থিতি নিয়েও আলোচনা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের অভিযোগ; তদন্তের কথা জানালেন বিএনপি ও যুবদলের নেতারা। খুলনার তেরখাদায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোল্লা হুমায়ুন কবিরের নির্বাচনী মতবিনিময় সভার মঞ্চে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় বিএনপিতে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সভায় উপস্থিত ব্যক্তিদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
গত ২৪ অক্টোবর তেরখাদা উপজেলার ২ নম্বর বারাসাত ইউনিয়নের পশ্চিম কাটিঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ নির্বাচনী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বারাসাত ইউনিয়নে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে সভাটির আয়োজন করেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোল্লা হুমায়ুন কবির।
তবে তাঁর আয়োজিত সভায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি এবং তাঁদের কয়েকজনকে মঞ্চে আয়োজকের পাশে বসে থাকতে দেখা যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের প্রশ্নে এমন ঘটনা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
সভায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শহীদ মোল্লা, বারাসাত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি শিকদার শহিদুল ইসলাম, সহসভাপতি আবুল বাশার মুসল্লী এবং সাধারণ সম্পাদক খান খালিদুজ্জামান।
এ ছাড়া একই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হিরু শেখ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের আহ্বায়ক মোল্লা মহিব, জেলা মৎস্যজীবী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কায়নাথ শিকদার এবং যুবদল নেতা মাকসুদুর রহমান সভায় উপস্থিত ছিলেন। সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদীর ধর্মছেলে হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত মেহেদী মোল্লাকেও সভায় দেখা যায়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মো. হিরু শেখ, মাকসুদুর রহমান, মোল্লা মহিব, কায়নাথ শিকদার ও মেহেদী মোল্লার বিরুদ্ধে থানায় নাশকতার মামলা রয়েছে। তাঁদের কয়েকজনকে সভার মঞ্চে মোল্লা হুমায়ুন কবিরের পাশে বসে থাকতে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে এসব মামলার বর্তমান অবস্থা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় ছিলেন, এমন আরও কয়েকজনও সভায় অংশ নেন। ফলে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তেরখাদা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সোহাগ মুন্সী বলেন, স্থানীয়ভাবে একটি বিরোধের পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী যুবদল নেতা মোল্লা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি সংসদ সদস্য ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের জানানো হয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করছেন তিনি।
সাবেক ছাত্রদল নেতা রাজু শেখ অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মীদের একটি অংশ বিএনপির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, মোল্লা হুমায়ুন কবিরের দুই ভাইসহ তাঁর বংশের অধিকাংশ সদস্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদীর ধর্মছেলে হিসেবে পরিচিত মেহেদী মোল্লার সঙ্গে হুমায়ুন কবিরের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
রাজু শেখ বলেন, বিএনপির রাজনীতি করতে গিয়ে তাঁকে সাতটি মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়, এমন কোনো কর্মকাণ্ড তিনি সমর্থন করেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা বিএনপির মধ্যম সারির একাধিক নেতা বলেন, দলের দুঃসময়ে যাঁরা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের মূল্যায়ন করা জরুরি। তাঁদের মতে, নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের উপস্থিতি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের অভিযোগের বিষয়ে তেরখাদা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক চৌধুরী কাউসার আলী বলেন, যুবদল নেতা মোল্লা হুমায়ুন কবিরের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের যে অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি জেলা যুবদলকে জানানো হবে। তারা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা তুহিন বলেন, শুধু বিএনপি নয়, জামায়াতের বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগ রয়েছে। তবে তেরখাদায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে তেরখাদায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুবদল নেতার নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্ত হয় কি না এবং এ ঘটনায় দলীয় পর্যায়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয় নেতাকর্মীদের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোল্লা হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

