রাজনীতি ডেস্ক:
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি ছিল না, বরং রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক দাবি ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ফিরে গেলে বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরও জবাবদিহি করতে হবে।
নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লিখেছেন, শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় বিএনপির অনেক কর্মকাণ্ডের জবাবদিহির প্রশ্ন তোলা হয়নি। তখন লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী শাসনের পতন নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ফিরে আসে, তাহলে মানুষের আত্মত্যাগ ও স্বপ্নের মূল্য কোথায়—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি আরও লেখেন, কর্নেল তাহেরের রক্তের প্রশ্ন, এক-এগারোর পেছনে রাজনৈতিক ব্যর্থতার হিসাব কিংবা ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ার বিষয়গুলো সামনে আনা হয়নি। কারণ, লক্ষ্য ছিল শুধু একজন শাসকের বিদায় নয়, বরং স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর অবসান ঘটানো।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা বলেন, সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নে ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা কী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই বছরের এপ্রিলে বিভিন্ন অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপির নিজস্ব বক্তব্য ও যুক্তি থাকতে পারে উল্লেখ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রশ্ন তোলেন, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ পাবে, নাকি ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের কাছে আবারও পরাজিত হবে।
বিএনপি সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির বিরোধিতা না করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্যান্য জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের বিরোধী নয় এনসিপি। তবে রাষ্ট্রের কাঠামো জবাবদিহিমূলক না হলে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না থাকলে, নির্বাচনব্যবস্থা মানুষের আস্থা অর্জন করতে না পারলে এবং প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে এসব কর্মসূচি দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব নয়।
সাধারণ মানুষের জীবিকা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর আঘাত এলে নীরব থাকার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, যে পরিবর্তনের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই পরিবর্তনকে দলীয় স্বার্থের কাছে বিসর্জন দেওয়া যায় না।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আরও বলেন, ২০২৪ সাল ছিল পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ। সেই সুযোগ হাতছাড়া হলে দায় শুধু অতীতের স্বৈরাচারী শাসকদের ওপর বর্তাবে না; বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরও জবাবদিহি করতে হবে। বিএনপির অতীত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ক্ষমতায় থেকে দলটি বর্তমানে কী করছে, তারও হিসাব দিতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো দলই জনগণের আত্মত্যাগের মালিক নয়, রাষ্ট্রের মালিকও নয়। জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।
জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে কোনো ক্ষমতাই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না এমন সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি লেখেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা ছিল জনগণের প্রত্যাশার সীমারেখা। সেই সীমারেখা অতিক্রম করে পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে গেলে জনগণ আবারও প্রশ্ন তুলবে। ক্ষমতার আড়ালে অন্যায়ের দায় সাময়িকভাবে আড়াল করা গেলেও তা চিরদিনের জন্য মুছে ফেলা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির এই নেতা।

