ন্যাশনাল ডেস্ক:
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এমনভাবে পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার বা সংসদ চাইলেই তা সহজে বাতিল করতে না পারে। এ ব্যবস্থা বাতিল বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নিতে গণভোটের বিধান রাখার কথা জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কমিটি।
গণভোটের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তন বা সংযোজন আনা হবে, সেগুলো কার্যকর করার আগে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। এটি হবে সাংবিধানিক গণভোট। এর আগে দেশে যে গণভোট হয়েছে, সেটি ছিল আইনি গণভোট।
সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক বিষয়গুলোতে পরিবর্তন এলে গণভোটের বিষয়টি সামনে আসবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর্টিকেল ৪৫৬-এ আসবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমরা ধারণ করব।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনের পর ভবিষ্যতে যাতে সহজে পরিবর্তন করা না যায়, সে বিষয়েও সাংবিধানিক সুরক্ষা রাখার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলেও যেন জনগণের কাছে যেতে হয়, সেই বিধান রাখা হবে।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়ার বৈধতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৪২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল। সেটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় হয়েছে। বিচার বিভাগের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধানে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি ধারণ করা হবে। সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলেও তা পুনরায় সংযোজন করা হলে সেটি কার্যকর করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি চূড়ান্ত হয়নি
তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে, কারা এতে থাকবেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, বিষয়টি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে। বর্তমানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে আইনজীবী, বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক বিকল্পও বিবেচনা করা হবে।
রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো প্রক্রিয়াই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে পারে। সেসব পর্যালোচনা করে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করতে চায় কমিটি।
শহীদ-আহতদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি
বিশেষ কমিটির বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়। এতে শহীদের মা-বাবা, ভাইসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মোট ৬৩ জন এতে অংশ নেন বলে জানানো হয়েছে।
মতবিনিময়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং শহীদ ও আহতদের সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবি ওঠে। পাশাপাশি জুলাই ঘোষণাপত্রের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংবিধানের উপযুক্ত জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পক্ষ থেকে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার দাবি জানানো হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবিও তোলা হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আন্তরিক। তদন্ত, প্রসিকিউশন ও চার্জ গঠনের বিষয়ে সরকারের কাজ দ্রুততার সঙ্গে করা হবে।
নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন
জুলাই জাতীয় সনদ নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘যেভাবে নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটা বাস্তবায়নে আমরা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সেই জুলাই জাতীয় সনদ অবশ্যই যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করব।’
তবে শুধু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করলে সংবিধান সংশোধনের অন্যান্য বিষয় বাদ পড়ে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত এবং অন্যান্য প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে একটি বিল সংসদে উপস্থাপনের জন্য প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিরোধী দলের লং মার্চ কর্মসূচি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি সংসদেই হবে।
আরও অংশীজনের মতামত নেবে কমিটি
ছয়টি বৈঠকে সংবিধান সংশোধনের কাজে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে—জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখনো আরও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা বাকি রয়েছে।
তিনি জানান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, বিচারক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি, আইন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হবে। এরপর এসব প্রস্তাব নিয়ে কমিটিতে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

