ন্যাশনাল ডেস্ক:
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মচারী। পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর সরবরাহের বিনিময়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নেওয়ার তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর কাওরান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম, চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম ও মো. হাসিনুর রহমান সুজন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম এবং এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ ও কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর।
যেভাবে ফাঁস হয় প্রশ্নপত্র
সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময় থাকলেও সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
এসআরবির তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলের কাছে পাঠান। পরে চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর তৈরি ও বিতরণের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়ে চক্রে যোগ
এসআরবি জানায়, প্রাথমিক তদন্তে রুবেল ও মফিজুলের মাধ্যমে চক্রটির আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। মফিজুল নিজেও একজন চাকরিপ্রত্যাশী ছিলেন। তদন্তে জানা গেছে, তিনি চক্রের এক সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছিলেন। পরে বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি ওই চক্রে যুক্ত হন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গত ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত রাজধানীর মতিঝিল, উত্তরখান, মিরপুর-১০ ও মোহাম্মদপুর এবং সাভারে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সময় এবং বিতরণপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।
বিপুল পরিমাণ নথি ও মোবাইল ফোন জব্দ
অভিযানে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, ২৫টি সনদপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংক চেক, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র, আটটি মোবাইল ফোন এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
প্রশ্নপত্রের উৎস সম্পর্কে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পাওয়ার দাবি করেছেন। তবে তাঁদের দেওয়া তথ্য এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তদন্ত দল। সংশ্লিষ্ট গ্রুপ ও আইডি যাচাই করা হচ্ছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ঘটনায় জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ওই অধিদপ্তরের কারও সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর মতিঝিল থানায় মামলা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

