চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে নিয়োগের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অপসারণের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তাকে অপসারণের নেপথ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান ছাত্রদল নেতাদের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে চুয়েট ছাত্রদল বলছে, সাবেক উপাচার্যের নিয়োগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল এবং সরকারের তদন্তের পরই তাকে অপসারণ করা হয়েছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আকস্মিক এ পরিবর্তনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো কারণ জানানো হয়নি।
এদিকে সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো বুধবারও আন্দোলন করেছেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেন তারা। অন্যদিকে ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের একটি অংশ নতুন উপাচার্যকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং অপসারিত উপাচার্যের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন।
দ্বিতীয় দিনের আন্দোলন, গণস্বাক্ষর
বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় দিনের মতো শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ রেখে ক্রিকেট খেলেন তারা। নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে আসার গুঞ্জনে আগের রাত থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গেট পাহারা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হয় গণস্বাক্ষর কর্মসূচি। শিক্ষার্থীরা নিজেদের রোল নম্বর উল্লেখ করে এতে স্বাক্ষর করেন। আন্দোলনকারীরা জানান, এসব স্বাক্ষর সাবেক উপাচার্যের প্রতি শিক্ষার্থীদের সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে রাষ্ট্রপতি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অধ্যাপক সায়েম শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অ্যালামনাইদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছিলেন। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ না জানিয়ে তাকে অপসারণ করায় তারা ক্ষুব্ধ।
যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী যুলকার নাঈন মিহাদ বলেন, ‘দুই মাসেরও কম সময়ে একজন উপাচার্য পুরো ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তার কোনো ভুল আমরা পাইনি। কেন তাকে অপসারণ করা হলো, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। আমরা তাকে স্বপদে বহাল চাই।’
যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহান হাসনাত আদিব বলেন, ‘আমরা আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করছি। এই স্বাক্ষর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। দাবি না মানা পর্যন্ত আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলবে।’
শিক্ষক সমিতিরও প্রশ্ন
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, এত অল্প সময়ে একজন উপাচার্যের কাজ মূল্যায়ন করা কঠিন। সরকার তাকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘কী এমন ঘটনা ঘটল যে দুই মাসও পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে অপসারণের প্রয়োজন পড়ল? বিশ্ববিদ্যালয় তো ভালোভাবেই চলছিল। আমার মনে হচ্ছে, এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।’
ছাত্রদলের পাল্টা অভিযোগ
তবে চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ দাবি করেছেন, চলমান আন্দোলনের পেছনে ছাত্রলীগ ও শিবির-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ইন্ধন রয়েছে। শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, শিক্ষক সমিতির ব্যানারে আওয়ামী লীগ আমলের বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্যরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং তাকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শরিফুল ইসলাম তুহিন বলেন, চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেক নেতারা শুরু থেকেই অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তার দাবি, ‘তিনি পতিত স্বৈরাচার সরকারের একজন সক্রিয় দোসর ছিলেন। তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রমাণ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে দেওয়া হয়েছে। সরকারের নিরপেক্ষ তদন্তেও বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে।’
তিনি আরও দাবি করেন, সাবেক উপাচার্য চুয়েটকে ছাত্রলীগের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন। তবে সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও অভিযোগ করেন শরিফুল ইসলাম তুহিন। তার ভাষ্য, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই অতীতে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এমন একাধিক প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। এসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে।’
নতুন ভিসি ক্যাম্পাসে যাননি
অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছালেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবার পর্যন্ত ক্যাম্পাসে যাননি।
এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং ছাত্রদল-সংশ্লিষ্টদের পাল্টা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে চুয়েটে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে সাবেক উপাচার্যের পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে নতুন উপাচার্যকে স্বাগত জানাচ্ছে ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট একটি অংশ।
সাবেক উপাচার্যকে অপসারণের প্রকৃত কারণ এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত এ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

